হিন্দু আর মুসলিম মোরা দুই সহোদর

বাণী

হিন্দু আর মুসলিম মোরা দুই সহোদর ভাই।
এক বৃন্তে দু’টি কুসুম এক ভারতে ঠাঁই॥
সৃষ্টি যাঁর মুসলিম রে ভাই হিন্দু সৃষ্টি তাঁরি
মোরা বিবাদ ক’রে খোদার উপর করি যে খোদকারি।
শাস্তি এত আজ আমাদের হীন-দশা এই তাই॥
দুই জাতি ভাই সমান মরে মড়ক এলে দেশে
বন্যাতে দুই ভাইয়ের কুটির সমানে যায় ভেসে।
দুই জনারই মাঠেরে ভাই সমান বৃষ্টি ঝরে —
সব জাতিরই সকলকে তাঁর দান যে সমান করে
চাঁদ সুরুযের আলো কেহ কম-বেশি কি পাই
বাইরে শুধু রঙের তফাৎ ভিতরে ভেদ নাই॥

আমারে চোখ ইশারায় ডাক দিলে হায়

বাণী

আমারে চোখ ইশারায় ডাক দিলে হায় কে গো দরদি।
খুলে দাও রং মহলার তিমির-দুয়ার ডাকিলে যদি।।
গোপনে চৈতী হাওয়ায় গুল্‌-বাগিচায় পাঠালে লিপি,
দেখে তাই ডাক্‌ছে ডালে কু কু ব’লে কোয়েলা ননদী।।
পাঠালে ঘূর্ণি-দূতী ঝড়-কপোতী বৈশাখে সখি
বরষায় সেই ভরসায় মোর পানে চায় জল-ভরা নদী।।
তোমারি অশ্রু ঝলে শিউলি তলে সিক্ত শরতে,
হিমানীর পরশ বুলাও ঘুম ভেঙে দাও দ্বার যদি রোধি।।
পউষের শূন্য মাঠে একলা বাটে চাও বিরহিণী,
দুঁহু হায় চাই বিষাদে, মধ্যে কাঁদে তৃষ্ণা-জলধি।।
ভিড়ে যা ভোর-বাতাসে ফুল-সুবাসে রে ভোমর কবি
ঊষসীর শিশ্‌-মহলে আস্‌তে যদি চাস্‌ নিরবধি।।

অ-মা! তোমার বাবার নাকে

বাণী

অ-মা! তোমার বাবার নাকে কে মেরেছে ল্যাং?
খাঁদা নাকে নাচ্‌ছে ন্যাদা-নাক ডেঙাডেং-ড্যাং!
ওঁর নাক্‌টাকে কে করল খ্যাঁদা র‍্যাঁদা বুলিয়ে?
চাম্‌চিকে-ছা ব’সে যেন ন্যাজুড় ঝুলিয়ে!
বুড়ো গুরুর টিকে যেন শুয়ে কোলা ব্যাং!
অ-মা! আমি হেসে মরি, নাক ডেঙাডেং-ড্যাং!
ওঁর খ্যাঁদা নাকের ছেঁদা দিয়ে টুকিকে দেয় ‌‘টু’!
ছোড়্‌দি’ বলে সর্দি ওটা, এ রাম! ওয়াক্‌! থুঃ
কাছিম যেন উপুড় হয়ে ছড়িয়ে আছেন ঠ্যাং!
অ-মা! আমি হেসে মরি, নাক ডেঙাডেং-ড্যাং!
দাদু বুঝি চীনাম্যান মা, নাম বুঝি চ্যাংচু?
তাই বুঝি ওঁর মুখ্‌টা অমন চ্যাপ্টা সুধাংশু!
জাপান দেশের নোটিশ উনি নাকে এঁটেছেন!
অ-মা! আমি হেসে মরি, নাক ডেঙাডেং-ড্যাং!
দাদুর নাকি ছিল না মা অমন বাদুড়-নাক,
ঘুম দিলে ঐ চ্যাপ্টা নাকেই বাজ্‌তো সাতটা শাঁখ,
দিদিমা তাই থ্যাবড়া মেরে ধ্যাব্‌ড়া করেছেন!
অ-মা! আমি হেসে মরি, নাক ডেঙাডেং-ড্যাং!
লম্ফানন্দে লাফ দিয়ে মা চ’লতে বেঁজির ছা,
দাড়ির জালে প’ড়ে যাদুর আটকে গেছে গা,
বিল্লি-বাচ্চা দিল্লি যেতে নাসিক এসেছেন!
অ-মা! আমি হেসে মরি, নাক ডেঙাডেং-ড্যাং!
দিদিমা কি দাদুর নাকে টাঙতে ‘আল্‌মানক্‌’
গজাল ঠুঁকে দেছেন ভেঙে বাঁকা নাকের কাঁখ?
মুচি এসে দাদুর আমার নাক ক’রেছে ‘ট্যান’!
অ-মা! আমি হেসে মরি, নাক ডেঙাডেং-ড্যাং!
বাঁশির মতন নাসিকা মা মেলে নাসিকে,
সেথায় নিয়ে চল দাদু দেখন-হাসিকে।
সেথায় গিয়ে করুন দাদু গরুড় দেবের ধ্যান,
খাঁদু-দাদু নাকু হবেন, নাক ডেঙাডেং-ড্যাং!

‘খাঁদু-দাদু’

[সঞ্চিতা, কাজী নজরুল ইসলাম, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা, ২০০৫]

কত কথা ছিল তোমায় বলিতে

বাণী

কত কথা ছিল তোমায় বলিতে
ভুলে যাই হয় না বলা পথ চলিতে।।
ভ্রমরা আসে যবে বনেরই পথে
না-বলা সেই কথা কয় ফুল-কলিতে।।
পুড়ে মরে পতঙ্গ, দীপ তবু
পারে না বলিতে, থাকে জ্বলিতে।।
সে কথা কইতে গিয়ে গুণীর বীণা
কাঁদে কভু সারঙ কভু ললিতে।।
যত বলিতে চাই লুকাই তত
গেল মোর এ জনম হায় মন ছলিতে।।

বাজিছে বাঁশরি কার অজানা সুরে

বাণী

বাজিছে বাঁশরি কার অজানা সুরে।
ডাকিছে সে যেন তার সুদূর বঁধুরে।।
তারা-লোকের সাথীরে যেন সে চাহে ধরাতে,
তারি কাঁদন যেন ঝরা কুসুমে ঝুরে।।
চাঁদের স্বপন ল’য়ে জাগে সে নিশীথ একা,
নিরালা গাহে গান হায় বিষাদ-মধুরে।।
তাহারি অভিমান যেন উঠিছে বাতাসে কাঁপি’,
তাহারি বেদনা দূর আকাশে ঘুরে।।

মম বন-ভবনে ঝুলন দোলনা দে দুলায়ে

বাণী

মম বন-ভবনে ঝুলন দোলনা দে দুলায়ে উতল পবনে
মেঘ-দোলা দুলে বাদল গগনে।।
আয় ব্রজের ঝিয়ারি পরি' সুনীল শাড়ি
নীল কমল কুঁড়ি দুলায়ে শ্রবণে।।
নবীন ধানের মঞ্জরি কর্ণে
তপ্ত বক্ষ ঢাকি' শ্যামল পর্ণে
ওড়না ছুপায়ে রাঙা রামধনু বর্ণে
আয় প্রেম-কুমারীরা আয় লো,
উদাসী বাঁশীর সুরে ডাকে শ্যামরায় লো।
ঝরিবে আকাশে অবিরল বৃষ্টি
শ্যাম-সখা সাথে হবে শুভ-দৃষ্টি
এই ঝুলনের মধু-লগনে।।